থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ | থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?

থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ
Share With

থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ জেনেটিক বা বংশগত । কেউ যখন কোন ত্রুটিপূর্ণ জিন তার বাবা-মায়ের কাছ হতে বংশানুক্রমে পায়, তখনই মূলত থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়।

আমাদের শরীরে যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে তা প্লাজমা, লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেতকণিকা, প্লেটিলেট ইত্যাদি উপাদানের মাধ্যমে গঠিত। আর এদের মধ্যে লোহিত রক্তকণিকার মধ্যে হিমোগ্লোবিন নামক প্রোটিন যার প্রধান দুটি উপাদান হল লৌহঘটিত রঞ্জক পদার্থ হেম বা আয়রণ (যার কারনে রক্ত লাল দেখায়) এবং প্রোটিন জাতীয় পদার্থ গ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনের কাজ হল অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অক্সিহিমোগ্লোবিন যৌগ উৎপন্ন করে শ্বসনের জন্য শরীরের কলাকোষে অক্সিজেন সরবরাহ করা এবং শ্বসনের ফলে উৎপন্ন কার্বনডাইঅক্সাইড কার্বামিনোহিমো গ্লোবিন যৌগরূপে কলাকোষে থেকে ফুসফুসে নিয়ে নাসারন্ধ্র দিয়ে শরীর থেকে নির্গত করা।

সাধারণত লোহিত কণিকার গড় আয়ু ১২০ দিন কিন্তু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের ক্ষেত্রে লোহিত কণিকাগুলি ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনের ফলে ৬০-৬৫ দিনের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়; ফলে  অ্যানিমিয়া (রক্তাল্পতা) দেখা দেয় । আবার ভঙ্গুর হিমোগ্লোবিন থেকে নির্গত অতিরিক্ত লৌহ পদার্থ রোগীর যকৃৎ ও প্লীহায় জমতে থাকে এবং এই গ্রন্থি দুটি সাইজে বাড়তে থাকে এবং ক্রমশ অকেজো হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়ে হৃৎপিন্ড, প্যানক্রিয়াস, যকৃত, অন্ডকোষ ইত্যাদি অঙ্গের কার্যক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়।

[irp]

অর্থাৎ হিমোগ্লোবিন আমাদের ফুসফুস থেকে শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহন করা অক্সিজেন দেহের বিভিন্নি কোষে বহন করে বলেই আমরা সুস্থ ও সবল হয়ে বেঁচে থাকি। তাছাড়াও এটি কোষ থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বহন করে ফুসফুসে নিয়ে যায় । হিমোগ্লোবিন চার ধরনের প্রোটিন গ্লোবিন চেইন(Globulin chains) দ্বারা গঠিত । স্বাভাবিক বয়ঃপ্রাপ্ত হিমোগ্লোবিনে দুটি আলফা চেইন ও দুটি বিটা চেইন থাকে । আলফা ও বিটা চেইন তৈরী হয় জিন হতে। দুই গ্রুপের হিমোগ্লোবিন চেইনের সংশ্লেষণ মূলত জেনেটিক্যালি নিয়ন্ত্রিত হয়। গর্ভাবস্থায় ভ্রুনে এবং শিশুদেহে হিমোগ্লোবিন দুটি বিটা চেইনের পরিবর্তে সাধারণত দুটি আলফা চেইন এবং দুটি গামা চেইন দ্বারা গঠিত হয়। শিশু বেড়ে ওঠার সাথে সাথে গামা চেইন গুলো বিটা চেইন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে থাকে এবং স্বাভাবিক বয়স্ক হিমোগ্লোবিন গঠন করে।

থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ জেনেটিক ডিসঅর্ডার বা জিনগত  ত্রুটির উপর নির্ভর করে । জেনেটিক ত্রুটির হিসাবে থ্যালাসেমিয়া দুইটি প্রধান ধরনের হতে পারে –

আলফা থ্যালাসেমিয়া :

আলফা থ্যালাসেমিয়ার জন্য 16 নং ক্রোমোজোমে উপস্থিত আলফা চেইন উৎপাদনকারী জিনের mutation বা deletion দায়ী। চারটি জিন দিয়ে আলফা চেইন তৈরি হয়। বাবা-মা থেকে প্রাপ্ত চারটি জিনের মধ্যে এক বা তার অধিক ত্রুটিপূর্ণ হলে আলফা থ্যালাসেমিয়া হয়। যত বেশি জিন ত্রুটিপূর্ণ হবে তত বেশি মারাত্মক সমস্যা দেখা দিবে। যেমন –

  •  একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে থ্যালাসেমিয়ার কোন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যাবে না। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তার সন্তানের মধ্যে এই রোগ ছড়াবে।
  •  দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হালকা উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থাকে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনর (Alpha-thalassemia minor) অথবা আলফা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট ( Alpha-thalassemia trait).
  •  তিনটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে এর উপসর্গগুলো মাঝারি থেকে মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই অবস্থাকে বলে হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ (Hemoglobin H Disease)।
  •  চারটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে একে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর (Alpha thalassemia major) অথবা হাইড্রপস ফিটালিস (Hydrops fetalis)। এর ফলে প্রসবের (delivery) পূর্বে অথবা জিনের পরপর ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যায়।

বিটা থ্যালাসেমিয়া

হিমোগ্লোবিনের বিটা চেইন উৎপাদিত হয় দুটি জিন দ্বারা। বাবা-মা থেকে প্রাপ্ত দুটি জিনের মধ্যে এক বা তার অধিক ত্রুটিপূর্ণ হলে বিটা থ্যালাসেমিয়া হয় এক্ষেত্রে –

o একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হালকা উপসর্গ দেখা যায়। এই অবস্থাকে বলে বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর (Beta-thalassemia minor) অথবা বিটা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট (Beta-thalassemia trait).

o দুটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে মাঝারি থেকে মারাত্মক উপসর্গ দেখা যায়। এ অবস্থাকে বলে বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর ( Beta-thalassemia major) অথবা কুলিস অ্যানিমিয়া (Cooley’s anemia)। নবজাতক যেসব শিশুর এই সমস্যা থাকে তারা জন্মের সময় বেশ স্বাস্থ্যবান থাকে। তবে জন্মের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই এর উপসর্গ দেখা যায়।

বিশ্বের আনুমানিক ৬০-৮০ মিলিওন মানুষ বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে। থ্যালাসেমিয়া স্বল্প উন্নত দেশ যেমন নেপাল,বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে বেশি দেখা যায়।আশঙ্কা করা হচ্ছে,আগামী ৫০ বছরে এ রোগ অনেক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রকারভেদ এর মধ্যে আরো দুটি রোগ আলোচনা করা হয় । যার প্রকোপ বাংলাদেশে বেশি । আর তা হচ্ছে হিমোগ্লোবিন-ই বিট থ্যালাসেমিয়া এবং হিমোগ্লোবিন ই ডিজিজ।

[irp]

হিমোগ্লোবিন ই বাহক এবং হিমোগ্লোবিন ই ডিজিজ 

বিটা থ্যালাসেমিয়া বাহকের মতোই একটি জেনেটিক ত্রুটি। এক্ষেত্রে এরা উত্তরাধিকার সূত্রে একটি হিমোগ্লোবিন ই জিন পেয়ে থাকে। কেউ যদি দুটি জিন প্রাপ্ত হয় তাকে হিমোগ্লোবিন ই ডিজিজ বলা হয়। তবে এ দুই অবস্থায় কারো কোন উপসর্গ দেখা যায়না। কেবল সামান্য রক্তস্বল্পতা হতে পারে যা স্বাভাবিক জীবন যাপনের অন্তরায় নয়। তবে গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে এরা যদি অন্য একজন বিটা থ্যালাসেমিয়া বাহককে বিয়ে করেন, সেক্ষেত্রে এদের সন্তানের হিমোগ্লোবিন ই বিটা থ্যালাসেমিয়া রোগ হবার সম্ভাবনা থাকে।

হিমোগ্লোবিন ই বিটা থ্যালাসেমিয়া

হিমোগ্লোবিন ই বিটা থ্যালাসেমিয়া একটি মিশ্র ধরনের হিমোগ্লোবিন ডিসঅর্ডার। যদি হিমোগ্লোবিন ই বাহক কারো সঙ্গে বিটা থ্যালাসেমিয়া বাহক এমন কারো বিয়ে হয় তবে পরের বংশধরদের হিমোগ্লোবিন ই বিটা থ্যালাসেমিয়া হতে পারে। আমাদের দেশে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক। এ ধরনের শিশুর রোগের তীব্রতা থ্যালাসেমিয়া মেজর থেকে ইন্টারমেডিয়া বা মাইনরের মতো হয়ে থাকে। রোগের তীব্রতা অনুযায়ী থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা বা প্রতিকার এর ধরন ঠিক হয়।

কেউ যখন কোন ত্রুটিপূর্ণ জিন তার বাবা-মায়ের কাছ হতে বংশানুক্রমে পায়, তখনই মূলত থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়। সুতরাং থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ বংশগত। যদি স্বামী-স্ত্রী দুজনই এ রোগের বাহক বা একজন  বাহক এবং একজন হিমোগ্লোবিন ই এর বাহক হয় তবে প্রতি গর্ভাবস্থায় শতকরা ২৫ ভাগ সম্ভাবনা থাকে এ রোগে আক্রান্ত শিশু জন্ম নেয়ার। বাহক শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ৫০ ভাগ। আর সুস্থ শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ২৫ ভাগ । তবে স্বামী স্ত্রী দুজনের যেকোন একজন যদি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকেন, তাহলে নবজাতকের থ্যালাসেমিক হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না। তবে নবজাতক থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে যা কোন রোগ নয়।

 

Summary
থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ | থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?
Article Name
থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ | থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?
Description
থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ জেনেটিক বা বংশগত । কেউ যখন কোন ত্রুটিপূর্ণ জিন তার বাবা-মায়ের কাছ হতে বংশানুক্রমে পায়, তখনই মূলত থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়।
Author
Publisher Name
ThalsBangla
Publisher Logo

Share With