থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কিভাবে সম্ভব?

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করুন
Share With

  থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা খুবই সম্ভব। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। যদি স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়া বাহক বা একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক এবং একজন হিমোগ্লোবিন ই এর বাহক হয় তবে প্রতি গর্ভাবস্থায় –

  •  এ রোগে আক্রান্ত শিশু জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ২৫ ভাগ ।
  • বাহক শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ৫০ভাগ।
  • আর সুস্থ শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ২৫ ভাগ।
থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ
থ্যালাসেমিয়া বাহক পিতা-মাতা থেকে থ্যালাসেমিয়া বাহক ও রোগী সন্তানের জন্ম

            স্বামী স্ত্রী দুজনের যেকোন একজন যদি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকেন, তাহলে নবজাতকের থ্যালাসেমিক হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না। তবে নবজাতক থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে যা কোন রোগ নয়।

         তাই এ রোগের বাহকদের মধ্যে বিয়ে নিরুৎসাহিত এবং প্রতিহত করার মাধ্যমে সমাজে নতুন থ্যালাসেমিক শিশুর জন্ম হ্রাস করা যায়।

          সুতরাং দেরী না করে  আজই থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় এর জন্য হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস নামক পরীক্ষাটি করান এবং আপনার শিশুকে এর অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখুন ।

             এছাড়া ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ন অর্থাৎ যেসব পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী দুজনই এ রোগের বাহক অথবা যাদের এক বা একাধিক থ্যালাসেমিক  শিশু আছে তারা গর্ভস্থ ভ্রুণ পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য থ্যালাসেমিক শিশু নির্ণয় এবং তা পরিহার (গর্ভপাত) করতে পারেন। গর্ভাবস্থার ১৬ থেকে ১৮ সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষাটি করালে ভালো হয়।

গর্ভস্থ সন্তানের থ্যালাসেমিয়া জানার জন্য যে পরীক্ষাগুলো করতে হবে :

  • কোরিওনিক ভিলিয়াস স্যাম্পলিং (Chorionic villus sampling)
  •  অ্যামনিওসেনটিসিস (Amniocentesis)
  •  ফিটাল ব্লাড স্যাম্পলিং (Fetal blood sampling)

           তাহলে আমাদের অনাগত প্রজন্ম যাতে থ্যালাসেমিয়ার মত একটি ভয়াবহ রোগ নিয়ে না জন্মায়, তার জন্য আমাদের প্রত্যেককে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতন হতে হবে ।

            এটি জন্মগত রোগ। সক্রামক বা ছোঁয়াচে নয়। এটি পিতামাতার কাছ থেকে জন্মগতভাবে সন্তানের মধ্যে আসে।

 [irp posts=”92″ name=”থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ | থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?”]

            পরিবারে কেউ একজন রোগী বা বাহক হলে সেই পরিবারের সব সদস্য এবং অন্যান্য রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয় থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয়ের পরীক্ষা করা অবশ্যই উচিত।

          এ রোগের বাহকদের বিয়ের আগে জীবনসঙ্গীর রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া উচিত। তাহলে ভবিষ্যৎ বংশধরদের এ রোগ হবার সম্ভাবনা থাকবে না।

        বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসাবে বাংলাদেশের ৩ শতাংশ জনসংখ্যা বিটা থ্যালাসেমিয়া বাহক অর্থাৎ প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশী এ জিন বহন করছে। আর হিমোগ্লোবিন ই এর বাহক ৪ শতাংশ অর্থাৎ ৬০ লাখ বাংলাদেশী। তার মানে সারা দেশে মোট ১ কোটি ৫ লাখ মানুষ এ জিন নিজের অজান্তেই বয়ে বড়াচ্ছেন। আপনিও হতে পারেন তাদের একজন।

হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস নামক রক্তের একটি পরীক্ষার মাধ্যমে আপনি এ রোগের বাহক কিনা জেনে নিন।

পরিসংখ্যান ও অবস্থা

          জেনেটিক রোগ সম্পর্কে সচেতন না থাকা ও আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের কারণে বাংলাদেশ, পাকিস্তানএইসব দেশগুলোতে থ্যালাসেমিয়ার দ্রুত বিস্তার ঘটছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় আট থেকে দশ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে ।

           ইতোমধ্যে সারাদেশে আক্রান্তর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখেরও বেশি শিশু। দেশে এ রোগের বাহক প্রায় দেড় কোটি মানুষ। তাইদ্রুত এই রোগ প্রতিরোধে সবাইকে সতর্ক হতে হবে।

           আমরা চাইলে আমাদের সমাজ হতে এই রোগ সম্পূর্ নির্মূল করতে পারি। প্রথমত বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে আমরা জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে পারি, যাতে কোনভাবে দুজন বাহকের বিয়ে না হয়ে যায়।

          যদি দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হয়েই যায়,গর্ভস্থ সন্তান কে পরীক্ষা করে, তার জন্মের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এইভাবে একদম সবাই সচেতন হলে আমাদের সমাজ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জীনের বিস্তার কমানো বা নিয়ন্ত্রণ এবং একসময় সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব।

          উল্লেখ্য যে, সাইপ্রাসে যেখানে আগে প্রতি ১৫৮ জন শিশুর একজন ছিলো থ্যালাসেমিয়ার রোগী, গর্ভস্থ পরীক্ষার মাধ্যমে এখন এই রোগীর সংখ্যা শুণ্যে নামানো সম্ভব হয়েছে। গ্রিস, ইতালিসহ অনেক দেশই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে । এগিয়ে আসতে হবে আমাদেরও। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি চাই ব্যক্তিগত সচেতনতা ।

            থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তুলতে প্রতি বছর ০৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস হিসাবে পালন করা হয়। আর এ দিনটি প্রতি বছর বিভিন্ন কর্মসূচিতে পালন করে সারা বিশ্বের দেশগুলো ও থ্যালাসেমিয়া সংগঠনগুলো। দিবসটিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা নতুন আশা ও সম্ভাবনা নিয়ে আসেন এ রোগের প্রতিকারের চেষ্টায়, আর প্রতিবছর এ দিনটি সমাজের খুব কমসংখ্যক মানুষকে সচেতন করে দিয়ে বিদায় নেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা আরও অনেক পশ্চাতে পড়ে আছি।.

বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া

          বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কিংবা চিকিৎসা, উভয় দিকের চিত্রই অত্যন্ত করুণ। থ্যালাসেমিয়া রোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পদ্ধতি— বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন অথবা নিয়মিত পরিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন, কোনোটাই এখানে এখনো সহজলভ্য নয়। রোগটি প্রতিরোধের কোনো সুষ্ঠু কার্যক্রমও সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ প্রতিবেশী প্রতিটি দেশই এ ব্যাপারে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর এ চেষ্টার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্ সংস্থাও সহযোগিতা করছে। আমাদের দেশের হাজার হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর পক্ষ থেকে এ দেশেই উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

            থ্যালাসেমিয়া এ দেশে নতুন কোনো রোগ নয়। কিন্তু এ রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা যেমন নেই, তেমনি এখানে এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ- সুবিধা এখনও নেই। থ্যালাসেমিয়া বাংলাদেশে প্রাণঘাতী রোগ হিসেবেই আতংকের কারণ হয়ে আছে।

          জন্মগত ও বংশগত রোগের তালিকায় থ্যালাসেমিয়া এখনও ভারি না হলেও কম নয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্ট অনুসারে পৃথিবীতে পাঁচ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের ‘বাহক’। আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘থ্যালাসেমিয়া’র কোনো বিশেষ অগ্রগতি না থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছে আর্থিক সামর্থ্যবান রোগীরা। আর যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তারা রোগ লালন করছে। রোগ যন্ত্রণায় অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টে দিনাতিপাত করছে এবং অকালে ঝরেও পড়ছে অনেক জীবন। কিন্তু আমরা যদি আমাদের দেশ থেকে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করতে দৃঢ়সংকল্প হই, তাহলে যে কাজগুলো আমাদের হাতে নিতে হবে, তা হচ্ছেঃ-

চাই প্রতিরোধ

☞ থ্যালাসেমিয়ার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি।
☞ দেশেই সর্বাধুনিক থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা।
☞ থ্যালাসেমিয়াবাহক শনাক্তকরণের পদ্ধতি সহজলভ্য করা।
☞ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক থ্যালাসেমিয়াকে একটা প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিতকরণ।
☞ বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক এনজিওগুলোকে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধকরণ।
☞ চিকিত্সক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীকে এ অসুস্থতার ব্যাপারে যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
☞ সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যাপারে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সভা-সমিতি আয়োজনের পদক্ষেপ নিতে হবে।
☞ স্বল্পব্যায়ে থ্যালাসেমিয়া রক্ত পরীক্ষা দেশের বিভিন্ন মেডিকেল ল্যাবরেটরিতে করানোর সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ও এনজিওগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে।

☞ মেডিকেল শিক্ষা কারিকুলামে থ্যালাসেমিয়াকে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে প্রত্যেক চিকিৎসকই থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারে।
☞ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেইএ ব্যাপারে সর্বদা নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

☞যদি পরিবারের কোনো সদস্যের থ্যালাসেমিয়া রোগের ইতিহাস থাকে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। গর্ভধারণ করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

☞ থ্যালাসেমিয়া থেকে বাঁচতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, এ রোগের বাহকদের শনাক্ত করা। এ জন্য স্ক্রিনিং কর্মসূচি গ্রহণ করে বাহকদের চিহ্নিত করে পরামর্শ দিতে হবে। দুজন বাহক যদি একে অন্যকে বিয়ে না করে তাহলে কোনো শিশুরই থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করা সম্ভব নয়।

☞প্রচারনার মাধ্যমেই সবাইকে সচেতন করতে হবে।

☞এখনতো বিশ্ব অনেক ছোট । বিভিন্ন মিডিয়া যেমন- সংবাদপত্র, টেলিভিশন, বেতার, ইন্টারনেটে বিভিন্ন মাধ্যমে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে জোর প্রচারনা চালিয়ে সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে ।

☞প্রতিবছর ৮ মে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এটি আরো ভালোভাবে প্রচার করতে হবে।

☞আমরা বিভিন্ন জাতীয় ‍দিবসে রক্তদান কর্মসূচী পালন করি । অনুরুপভাবে যদি বিনামূল্যে বিভিন্ন সংগঠন মানুষের রক্ত পরীক্ষা করার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগী বা বাহক সনাক্ত করতে পারে । এতে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বাড়বে আবার রোগী বা বাহকও সনাক্ত হবে ।

☞ সর্বোপরি থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সমন্বিত কর্মসূচি প্রণয়নে জাতীয় পর্যায়ে কনসালটেটিভ বৈঠকের আয়োজন করা এবং জাতীয় থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচি প্রণয়ন করা।
আর এই কাজগুলা বাস্তবায়নে দেশের সুশীল ও তরুন সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে ।

 

               পরিশেষে বলতে চাই, থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমেই একমাত্র এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।  তাই থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে নিজে জানুন এবং অন্যকেও জানতে সহায়তা করুন।

Summary
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কিভাবে সম্ভব?
Article Name
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কিভাবে সম্ভব?
Description
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা খুবই সম্ভব। যদি স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়া বাহক বা একজন বাহক এবং একজন হিমোগ্লোবিন ই এর বাহক হয় তবে প্রতি গর্ভাবস্থায় শতকরা ২৫ ভাগ সম্ভাবনা থাকে এ রোগে আক্রান্ত শিশু জন্ম নেয়ার। বাহক শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ৫০ভাগ। আর সুস্থ শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ২৫ ভাগ ।
Author
Publisher Name
ThalsBangla
Publisher Logo

Share With