থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) কি? থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা

Share With

থ্যালাসেমিয়া  (Thalassemia) কি?

          থ্যালাসেমিয়া  একটি বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ । এ রোগ পিতা মাতার কাছ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জিনের মাধ্যমে সন্তানের শরীরে আসে।

 জিন হচেছ মানব কোষের ডিএনএ(DNA) এর মধ্যে সংরক্ষিত এক প্রকারের তথ্য যা মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারন করে।

          থ্যাল রোগীর জিনগত ত্রুটির কারণে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়।  ফলে রোগীর অস্থিমজ্জায় ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন উৎপন্ন হয়। এ রোগে আক্রান্ত মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতা এবং অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতাতে ভুগে থাকেন। অ্যানিমিয়ার ফলে অবসাদগ্রস্ততা থেকে শুরু করে নানা জটিলতা ঘটতে পারে।

             এ রোগ মাত্রা অনুযায়ী মৃদু, মাঝারি বা তীব্র এভাবে তিন ধরনের হতে পারে। বেশির ভাগ তীব্র থ্যালাসেমিয়া রোগী ভীষণ রক্তস্বল্পতায় ভোগে এবং এদের প্রতি দুই চার সপ্তাহ পর পর নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে কিছুই দরকার হয় না। আবার, একদল আছে এ দুইয়ের মাঝামাঝি, অর্থাৎ এদের মাঝে মাঝে রক্ত দিতে হয়।

[irp posts=”97″ name=”থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রকারভেদ”]

                          তবে জিনগত ত্রুটি বিবেচনায় এ রোগ দুইটি প্রধান ধরনের হতে পারে-

  • আলফা থ্যালাসেমিয়া ও
  •  বিটা থ্যালাসেমিয়া।

                সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া বিটা থ্যালাসেমিয়া থেকে কম তীব্র । আলফা থ্যালাসেমিয়াবিশিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ মৃদু বা মাঝারি প্রকৃতির হয়। অন্যদিকে বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা বা প্রকোপ অনেক বেশি; এক-দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে ঠিকমত চিকিৎসা না করলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে বিশ্বে বিটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি। আলফা থ্যালাসেমিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের সর্বত্র এবং কখনও কখনও ভূমধ্যসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়।

                     প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১ লক্ষ শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।  আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি নারী-পুরুষ নিজের অজান্তে এ রোগের বাহক। আর তাদের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মায়।

 

থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়

থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়

                              থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । কারণ আমাদের কেউ এ রোগের বাহক কিনা তা জানার পর এর বিস্তার ঠেকাতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারব। আর কথায় বলে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম । এ বংশগত রোগ থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে রক্ষার জন্য এই কথাটি আরো বেশি করে প্রযোজ্য । কেননা  এ রোগের কোন সহজ প্রতিকারই নেই। একবার রোগী হয়ে জন্ম নিলে আজীবন ভুগতে হতে পারে । শুধু রোগী নয় পরিবারকেও অনেক কষ্ট করতে হয় ।

তাই আগে চাই থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় ।

                        রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে লোহিত রক্তকণিকার মাত্রা, লোহিত রক্ত কণিকার আকারের পরিবর্তন, বিবর্ণ লোহিত রক্ত কণিকা, লোহিত রক্ত কণিকায় হিমোগ্লোবিনের অসম থাকা, শিশুর রক্তে আয়রণ ও লৌহের পরিমাণ, হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ইত্যাদি জানা যায়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা অথবা রোগী ত্রটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জিন বহন করছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। কিছু লক্ষণ ও রক্তের কয়েকটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে থ্যালাসেমিয়া রোগ সন্দেহ ও পরবর্তীতে পর্যবেক্ষন করা হয়। যেমন- রক্তের কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট(CBC), ব্লাড ফ্লিম(PBF) ইত্যাদি ।

তবে নিশ্চিতভাবে আমরা থ্যালাসেমিয়া রোগী বা বাহক কিনা তা জানতে হলে আমাদেরকে রক্তের বিশেষ ধরনের পরীক্ষা  হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস (Hemoglobin Electrophoresis) এর মাধ্যমে জানতে হবে ।

এছাড়া ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ন অর্থাৎ যেসব পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী দুজনই এ রোগের বাহক অথবা যাদের এক বা একাধিক থ্যালাসেমিক  শিশু আছে তারা গর্ভস্থ ভ্রুণ পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য থ্যালাসেমিক শিশু নির্ণয় এবং তা পরিহার (গর্ভপাত) করতে পারেন। গর্ভাবস্থার ১৬ কে ১৮ সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষাটি করালে ভালো হয়।

[irp posts=”118″ name=”থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কিভাবে সম্ভব”]

গর্ভস্থ সন্তানের থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়ের জন্য যে পরীক্ষাগুলো করতে হবে :

•  কোরিওনিক ভিলিয়াস স্যাম্পলিং (Chorionic villus sampling)

•  অ্যামনিওসেনটিসিস (Amniocentesis)

•  ফিটাল ব্লাড স্যাম্পলিং (Fetal blood sampling)

থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করার পর রোগীদের নিয়মিত যেসব বিষয় খেয়াল রাখা উচিত

  •   নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো।
  •   রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ১০ গ্রাম বা ডেসিলিটার রাখার চেষ্টা করতে হবে।
  •   হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা নেওয়া।
  •   শিশুরোগীর ক্ষেত্রে প্রতি তিন মাস অন্তর উচ্চতা, ওজন, লিভার ফাংশন পরীক্ষা করা।
  •   আট থেকে ১০ ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পর রক্তে লৌহের পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে।
  •   শিশুর প্রতিবছর বুদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা।
  •  রক্তে লৌহের মাত্রা এক হাজার ন্যানো গ্রাম বা মিলি লিটারের ওপরে হলে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া।
  •   বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন নিশ্চিত করা।
Summary
থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) কি? থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা
Article Name
থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) কি? থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা
Description
থ্যালাসেমিয়া  একটি বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ । এ রোগ পিতা মাতার কাছ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জিনের মাধ্যমে সন্তানের শরীরে আসে। জিনের ত্রুটির কারণে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। ফলে রোগীরা সাধারণত রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়াতে ভুগে থাকেন।
Author
Publisher Name
ThalsBangla
Publisher Logo

Share With