কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় ভুগছেন? | মুক্তির সহজ উপায়

কোষ্ঠকাঠিন্য
Share With

    পায়খানার সমস্যার মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য বা পায়খানা কষা এমন এক জ্বালার নাম যাতে জীবনের কোন না কোন সময় আমরা সবাই ভুগেছি। তো কি এই জ্বালা?  চলুন শুনি –

  • পায়খানা হচ্ছে না বা না হলে কি করব?
  • পায়খানা শক্ত বা কষা হলে কি করব?
  • পায়খানা নরম করার উপায় বা ঔষধ কি?
  • কোষ্ঠকাঠিন্য হলে করণীয় কি?

তো চলুন জানি প্রশ্নগুলোর উত্তর-

 

কোষ্ঠকাঠিন্য কি ?

পর্যাপ্ত আঁশ যুক্ত খাবার খাওয়ার পরও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় পর পর শক্ত মলত্যাগের নামই কোষ্ঠকাঠিন্য। টয়লেটে অনেক সময় কাটার পরও মলত্যাগ ঠিকমত সম্পর্ণ হয় না। মনে হয় আরেকটু হবে।

সাধারণত  তিনদিনের বেশি সময় ধরে পায়খানা না হলে মল শক্ত হয়ে শুরু হয় কোষ্ঠকাঠিন্য।তবে সময়ের এ হিসাব সবার জন্য একইরকম নাও হতে পারে।

[irp]

কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ :

কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ

প্রাথমিক লক্ষণ

  • মল শক্ত ও অল্প পরিমানে হয়
  • আঙুল, গ্লিসারিন সাপোজিটরি কিংবা অন্য কোনো ভাবে পায়খানা বের করা
  • শক্ত মল ত্যাগে স্বাভাবিকের চেয়ে
  • তলপেট ভারী, শক্ত ও ফোলা মনে হয়
  • বেশিসময়  লাগে
  • মলত্যাগের পর মলত্যাগ সম্পূর্ণ  হয়নি
  • তলপেটে অস্বস্তি
  • এমন অনুভূতি
  • খাওয়া-দাওয়ায় অনীহা, ক্ষুধামন্দা ভাব
  • পায়খানার জন্য বেশি কোৎ বা চাপ দিতে হয়দেখা দেয়।

সিরিয়াস লক্ষণ

  • তলপেটে ব্যাথা
  • বমি হতে পারে বা বমি ভাব থাকতে পারে।
  • চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমা
  • পায়খানার সাথে রক্ত বা সাদা মিউকাস যাওয়া
  • নিজচেষ্টায় কোনভাবেই পায়খানা করতে না পারা

কোষ্ঠকাঠিন্যের সঙ্গে আরো কিছু সমস্যা দেখা দেয় যেমন-

  •  মুখে দুর্গন্ধ হওয়া
  •  জিহ্বায় সাদা আস্তরণ পড়া,
  •  মাথা ধরা,
  • খাবারে অরুচি,
  • পেট ব্যথা ইত্যাদি৷

কোষ্ঠকাঠিন্য কত ধরনের ?

কোষ্ঠকাঠিন্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

  • একুইট এবং(সাময়িক এবং সহজে ভালো হয়ে যায়) এবং
  • ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী এবং সহজে ভালো হতে চায় না)

কোষ্ঠকাঠিন্য কেন হয় পায়খানা না হওয়ার কারণ কি?

ব্যক্তিবিশেষে পায়খানা কষা হওয়ার এক বা একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

জীবনধারন খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের কারণে

  • পর্যাপ্ত পানি ও আঁশযুক্ত খাবার না খেলে
  • খাদ্যাভ্যাসে ও জীবনধারায় পরিবর্তন
  • প্রচুর দুগ্ধজাতীয় খাবার খেলে
  • শারীরিক শ্রম না করলে
  • পায়খানার চাপ আসলে টয়লেটে না যাওয়া বা পায়খানা আটকে রাখলে
  • Lexative জাতীয় ওষুধ খেয়ে পায়খানা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে
  • অতিরিক্ত চা, কফি, পান খেলে
  • চর্বি জাতীয় ও আমিষ জাতীয় খাবার বেশি খেলে।

কোষ্ঠকাঠিন্য এবং লাইফস্টাইল

বিভিন্ন রোগ শারীরিক অবস্থার  কারণে

  • সাধারনত বয়সজনিত কারণে
  • গর্ভাবস্থায়
  • শক্ত খাবার থেতে শুরু করা বাচ্চাদের (যথেষ্ট আাঁশযুক্ত খাবার না খেলে)
  • মানসিক চাপে
  • এনাল ফিশার
  • আই, বি, এস থাকলে
  • অটোনোমিক নিওরোপ্যাথি (Autonomic neuropathy)
  • মাল্টিপল স্কেলেরোসিস (Multiple sclerosis)
  • পারকিনসনস ডিজিজ (Parkinson’s disease)
  • স্নায়রজ্জুতে আঘাত (Spinal cord injury)
  • স্ট্রোক (Stroke)
  • পরিপাকতন্ত্রের কোন সমস্যায়
  • কোলন ক্যান্সার
  • ডায়াবেটিস
  • হাইপারথাইরয়েডিজম
  • হাইপোথাইরয়েডিজম

বিভিন্ন ওষুধের কারণে

  • কিছু মল নরম করার ওষুধের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হলে
  •  কড়া ব্যাথার ওষুধ (Nacrotics) যেমন-codeine, oxycodone and gydromorphone
  • কিছু বিষন্নতারোধী ওষুধ (antidepressants) যেমন-  amitriptyline, imipramine
  • আয়রন জাতীয় ওষুধ
  • ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকিং জাতীয় ওষুধ যেমন-
  • ডিলটিয়াজিম  (Cardizem) এবং নিফিডিপিন
  • এলমুনিয়াম সমৃদ্ধ এন্টাসিড যেমন- এলমুনিয়াম হাইড্রোক্সাইড সাসপেনশান এবং এলুমিনিয়াম কার্বেোনেট
  • কিছু খিঁচুনীরোধী (Anticonvulsants) ওষুধ  যেমন- phenytoin and carbamazepine

এরকম ক্ষেত্রে, প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে হবে।

কোষ্ঠকাঠিন্য পরবর্তী জটিলতা :

  • মলদ্বারের ভিতর শিরা ফুলে ওঠা (hemorrhoids).
  • পায়ুপথে ক্ষত হওয়া (anal fissure)
  • কোন ভাবেই নিজে নিজে পায়খানা করতে না পারা (fecal impaction)
  • মলদ্বারের ভিতরের ফোলা অংশ বাইরে বের হয়ে আসা  (rectal prolapse)
  • পায়ুপথ দিয়ে পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া এবং ফলে রক্তশূন্যতা
  • মানসিক অবসাদ ইত্যাদি

নিয়মিত পায়খানা ক্লিয়ার হওয়ার  সহজ উপায়

  • কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার খাবার আঁশযুক্ত খাবার যেমন- শিম, শাকসবজি, ফল, লালরুটি, কলা, গাজর, টকদই, পাকা বরই, বচিকি দানা, বেলের শরবত, কাঠবাদামের তেল, শসা, খোসাসহ আপেল, পার্লংশাক, লালচাল, লাল আটা, পপকর্ন, কমলা, কিসমিস
  • কম আঁশযুক্ত খাবার যেমন- প্রক্রিয়াজাত খাবার, দুগ্ধজাতীয় ও মাংসজাত খাবার কম খান
  • প্রচুর পানি বা তরল জাতীয় খাবার খান। আপনার ডাক্তারের কোন নিষেধ না থাকলে।
  • কায়িক শ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম করা
  • মানসিক চাপ পরিহার করা
  • পায়খানা চেপে না রাখা
  • নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস গড়ে তোলা।
  • শিশুদের ক্ষেত্রে যারা শক্ত খাবার থেতে শুরু করেছে তাদের  পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার দেওয়া

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার সহজ ঘরোয়া আয়ুর্বেদিক এবং প্রাকৃতিক উপায়

কোষ্ঠকাঠিন্যে কি খাব
কোষ্ঠকাঠিন্যে আঁশযুক্ত খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহন করুন

পায়খানা কষা বা শক্ত হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে আমরা কিছু ঘরোয়া ও আয়ুর্বেদিক উপায় চেষ্টা করে দেখতে পারি। প্রাথমিক অবস্থায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে এতেই কাজ হয়। কিন্ত উপরে উল্লেখিত সিরিয়াস লক্ষনের ক্ষেত্রে আমাদেরকে দেরী না করে অবশ্যই ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হবে।

  • প্রতিদিন সকালে ইসবগুলের ভুসির শরবত খালি পেটে পান করা
  • বিভিন্ন উদ্দীপক চেষ্টা করা, যেমন- জলের ধারা পড়ার শব্দ হলে পায়াখানার বেগ হয়
  • হালকা গরম দুধ বা পানীয় পান করা
  • পাকা মিষ্টি কুল বা বরই থেকে বীজ ও খোসা ফেলে বাকিটা অল্প পানিতে মিশিয়ে খাওয়া
  • বেলের শরবত খাওয়া
  • ২ গ্রাম বুচকি বীজ পিষে গরম দুধ বা পানীয়ের সাথে মিশিয়ে রাতে শোবার আগে পান করা
  • সোনাপাতা, এলোভেরা বা ঘৃতকুমারীর রস পানি বা ফলের জুসের সাথে মিশিয়ে পান করা
  • এক গ্লাস গরম পানিতে দুই টেবিল চামচ কাঁচা অ্যাপেল সিডার ভিনেগার ও দুই টেবিল চামচ কাঁচা মধু ‍ুমিশিয়ে পান করা
  • রাতে শোবার এক ঘন্টা আগে একটি খোসাসহ আপেল খাওয়া
  • রাতে একটি সাদা এলাচ দানা এক কাপ গরম দুধে ভিজিয়ে সকালে এলাচটি থেঁতো করে দূধসহ খেতে হবে।
  • এক গ্লাস গরম দুধে দশ বারোটি কিসমিস ও এক চিমটি দারুচিনির গুড়া দিয়ে ভালোভাবে ফুটিয়ে তা পান করতে হবে। টানা তিন দিন খেলে কোষ্ঠ্যকাঠিন্য কেটে যাবে।
  • কারো কারো ক্ষেত্রে কফি পেট নরম করতে সাহায্য করে
  • রাতে এক গ্লাস গরম দুধে এক চা চামচ মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে পান করা
  • এক চা চাচন ত্রিফলা পাউডার এক গ্লাস গরম পানিতে বা গরম দুধে বা কমলার জুসে মিশিয়ে রাতে শোবার আগে নিয়মিত পান করতে হবে
  • তিলবীজ গুড়া আটা বা ময়দার সাথে মিশিয়ে ‍ রুটি খেলে তা ফাইভারের ভালো উৎস হিসাবে কাজ করে।
  • বাদাম, ওলিভ ওয়েল, অ্যাভোকাডোর মতো স্বাস্থ্যকর ফলও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে পারে

কখন ডাক্তারের কাছে যাব?

কখন ডাক্তারের কাছে যাব
কখন ডাক্তারের কাছে যাব

দীর্ঘদিন ধরে নিজে নিজে বা ফার্মাসিস্ট বা হাতুড়ে ডাক্তারের পরামর্শে  ওষুধ ব্যবহার করে পায়খানা করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই ভালো ডাক্তারের পরামর্শে কোষ্ঠকাঠিন্যের সঠিক কারণ বের করে তার চিকিৎসামত ওষুধ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো সমাধান।  ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পূর্বে আমরা নিচুর কিছু উপায় চেষ্টা করে দেখতে পারি তবে তা অবশ্যই দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়-

  • ফাইবারসমৃদ্ধ বিভিন্ন পাউডার পাওয়া যায় ওষুধের দোকানে তা পানিতে মিশিয়ে খেতে হয়
  • বিভিন্ন ল্যাক্সেটিভ জাতীয় ওষুধ যেমন- মিল্ক অব ম্যাগনেশিয়া, ল্যাকটুলোজ, ডুরালাক্স, ল্যাকসেনা
  • পায়ুপথে ব্যবহারের জন্য গ্লিসারিন সাপোজিটরি
  • কোন ওষুধের কারণে হয়ে থাকলে ডাক্তারের পরামর্শে তার ডোজ এডজাস্ট/বন্ধ/বিকল্প ওষুধ নিতে হবে

কোষ্ঠকাঠিন্য চিকিৎসায় ডাক্তার কি কি চিকিৎসা দিতে পারেন-

  • মিনারেল ওয়েল ও Enema: এটি তরল ওষুধ যা পায়ুপথে লাগানো হয়। এটা সাধারনত সার্জারি বা বা কোন চিকিৎসা প্রক্রিয়ার আগে ব্যবহার করা হয়।
  • প্রেসক্রিপশানকৃত খাওয়ার বা ব্যবহারের ওষুধ যা আপনার কোষ্ঠকাঠিন্যের সাময়িক উপশম এবং কারণগুলো দূর করার জন্য।
  • কোন উপদেশ, ব্যায়াম বা কোন পদ্ধতি
  • Electrical pacing
  • সার্জারি বিরল সিরিয়াস কারণে

আমাদের দেশের অনেক প্রাকৃতিক জড়িবুটির চিকিৎসার প্রতি আগ্রহী। কেননা তা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন। তাই আপনারা বা স্বজন যারা পায়খানার এ সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছেন তারা উপরে দেয়া ঘরোয়া ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা নিতে পারেন। কিন্তু হারবাল চিকিৎসার নামে আমাদের দেশে কিছূ দুষ্ট চক্র প্রতারনার মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত মানুষের অর্থ ও সঠিক চিকিৎসার মূল্যবান সুযোগ ও সময় নষ্ট করছে। তাই এদের  চটকদার বিজ্ঞাপনে আগ্রহী না হয়ে আপনার রোগের লক্ষণ সিরিয়াস ও ক্রনিক হলে দয়া করে সঠিক ও ভালো ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসা করান।

কোষ্ঠকাঠিন্য যে কারোই হতে পারে। এটি কোন লজ্জার কোন বিষয় নয়। চিকিৎসা ও শিক্ষা নিয়ে লজ্জা করে কোন উপকার নেই। তাই দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। পরিশেষে  সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করি।

আর কোষ্ঠকাঠিন্য বা Constipation সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে নিচের লিংকে যেতে পারেন-

What is new in the treatment of constipation?

Summary
কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় ভুগছেন? | মুক্তির সহজ উপায়
Article Name
কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় ভুগছেন? | মুক্তির সহজ উপায়
Description
পায়খানার সমস্যার মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য বা পায়খানা কষা এমন এক জ্বালার নাম যাতে জীবনের কোন না কোন সময় আমরা সবাই ভুগেছি। তো কি এই জ্বালা? চলুন শুনি - পায়খানা হচ্ছে না বা না হলে কি করব? পায়খানা শক্ত বা কষা হলে কি করব? পায়খানা নরম করার উপায় বা ঔষধ কি? কোষ্ঠকাঠিন্য হলে করণীয় কি? তো চলুন জানি প্রশ্নগুলোর উত্তর-
Author
Publisher Name
ThalsBangla
Publisher Logo

Share With